গাইবান্ধা জেলা শহরে তীব্র আকার ধারণ করেছে জ্বালানি সংকট। সরবরাহ কমে যাওয়ায় অনেক ফিলিং স্টেশনে পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে সীমিত পরিমাণে। কোথাও ২০০ টাকার বেশি তেল দেওয়া হচ্ছে না, আবার কোনো কোনো পাম্পে সেই পরিমাণটুকুও মিলছে না। জ্বালানি সংকটের কারণে ইতোমধ্যে একটি ফিলিং স্টেশন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
শুক্রবার (১৩ মার্চ) সন্ধ্যায় শহরের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশন ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
জানা গেছে, জেলা শহর ও আশপাশের এলাকায় পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেল সরবরাহের জন্য চারটি ফিলিং স্টেশন রয়েছে। এর মধ্যে শহরের কেন্দ্রস্থলে দুটি পাম্প—গাইবান্ধা-সাঘাটা সড়কের পুলিশ লাইন্স সংলগ্ন একটি এবং দাড়িয়াপুর রোড এলাকায় আরেকটি।
পুলিশ লাইন্স সংলগ্ন মেসার্স হাসনা এন্ড সন্স ফিলিং স্টেশন জ্বালানি না থাকায় গত দুই দিন ধরে বন্ধ রয়েছে।
শহরের সবচেয়ে বড় ফিলিং স্টেশন বিডি রোডের বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অবস্থিত এস এ কাদির এন্ড সন্স ফিলিং স্টেশন। এখানে দুটি পেট্রোল ও দুটি অকটেন মেশিন থাকলেও পেট্রোল শেষ হয়ে যাওয়ায় দুটি মেশিন বন্ধ রাখা হয়েছে। বর্তমানে একটি অকটেন মেশিন চালু রেখে মোটরসাইকেল চালকদের সর্বোচ্চ ২০০ টাকার অকটেন দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে বাসস্ট্যান্ডের পশ্চিম পাশে অবস্থিত রহমান ফিলিং স্টেশনেও ডিজেল শেষ হয়ে যাওয়ায় ডিজেল সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে।
ফিলিং স্টেশন সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, গাইবান্ধা জেলা শহরে প্রতিদিন প্রায় ৭ হাজার লিটার পেট্রোল, ৪ হাজার লিটার অকটেন এবং প্রায় ৩২ হাজার লিটার ডিজেলের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে সরবরাহ হচ্ছে চাহিদার অর্ধেকেরও কম। ফলে পাম্পগুলোতে স্বাভাবিকভাবে জ্বালানি সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।
পাম্প মালিক ও কর্মচারীরা জানান, সরকারিভাবে জ্বালানির পর্যাপ্ত মজুদের কথা বলা হলেও বাস্তবে তারা চাহিদামতো তেল পাচ্ছেন না। অগ্রিম টাকা জমা দিয়েও নির্ধারিত পরিমাণ জ্বালানি সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। এর ফলে প্রতিদিনই পাম্পে তেল নিতে আসা গ্রাহকদের সঙ্গে কর্মচারীদের তর্ক-বিতর্কের ঘটনাও ঘটছে।
সংকট সামাল দিতে জেলা প্রশাসনের তদারকিতে সীমিত পরিমাণে জ্বালানি সরবরাহের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সেই অনুযায়ী প্রতি মোটরসাইকেলে ২০০ টাকার পেট্রোল বা অকটেন, দূরপাল্লার বাস ও ট্রাকে ২০০ থেকে ২২০ লিটার ডিজেল, পিকআপে ৭০ থেকে ৮০ লিটার এবং প্রাইভেটকারে সর্বোচ্চ ১০ লিটার অকটেন দেওয়া হচ্ছে।
এস এ কাদির এন্ড সন্স ফিলিং স্টেশনের ক্যাশ সরকার মিঠু মিয়া বলেন, প্রতিদিন তাদের পাম্পে প্রায় ২০০০ থেকে ২৫০০ লিটার পেট্রোল, ১৫০০ থেকে ২০০০ লিটার অকটেন এবং প্রায় ১২ হাজার লিটার ডিজেলের চাহিদা থাকে। কিন্তু দুই দিন পরপর পেট্রোল ও অকটেন মিলিয়ে মাত্র ৪৫০০ লিটার দেওয়া হচ্ছে। ডিজেলও একইভাবে সীমিত পরিমাণে আসছে।
তিনি বলেন, “আমাদের পেট্রোল ও ডিজেল প্রায় শেষ হয়ে গেছে। কিছু অকটেন আছে, সেটাও অল্প সময়ের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে। শনিবার সন্ধ্যার দিকে তেল আসার কথা থাকলেও নিশ্চিত নয়।”
রহমান ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার জুয়েল মিয়া জানান, তাদের পাম্পে প্রতিদিন প্রায় ২০০০ লিটার পেট্রোল, ১৫০০ লিটার অকটেন এবং ১০ হাজার লিটার ডিজেলের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু ছয় দিন পর তারা মাত্র ৩০০০ লিটার জ্বালানি পেয়েছেন। শুক্রবার সকালেই ডিজেল শেষ হয়ে গেছে।
অন্যদিকে বন্ধ হয়ে যাওয়া মেসার্স হাসনা এন্ড সন্স ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার মেহেদী হাসান বলেন, “১১ মার্চ থেকে আমাদের পাম্প বন্ধ রয়েছে। তেল না পেলে চালু করব কীভাবে?”
এদিকে সীমিত জ্বালানি দেওয়াকে কেন্দ্র করে অনেক গ্রাহক ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। পাম্প কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, কেউ কেউ জোর করে বেশি তেল নেওয়ার চেষ্টা করছেন। না দিলে হুমকি-ধমকি এমনকি ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটছে।
শুক্রবার সন্ধ্যা সাতটার দিকে কয়েকজন স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিকে একটি পাম্পে এসে কর্মচারীদের হুমকি দেওয়া এবং অফিস কক্ষে ঢুকে চড়াও হওয়ার অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
জ্বালানি না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরছেন অনেক চালক। মোটরসাইকেল চালক রুহুল আমিন বলেন, “সরকার বলছে তেলের কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু বাস্তবে পাম্প বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আমরা চাই পর্যাপ্ত তেল সরবরাহ নিশ্চিত করা হোক।” তেল নিতে আসা সিরাজ উদ্দিন বলেন, “পাঁচ কিলোমিটার দূর থেকে এসেছি। ২০০ টাকার বেশি তেল দেয় না। আবার পেট্রোলও নেই, বাধ্য হয়ে অকটেন নিতে হচ্ছে।”
আরেক গ্রাহক নয়ন সরকার বলেন, “এক পাম্পে সীমা নির্ধারণ করা হলেও পাশের পাম্পে আবার ভিন্ন নিয়মে তেল দেওয়া হচ্ছে। এতে সমস্যার সমাধান হচ্ছে না।”
এদিকে নান্নু পরিবহন নামে একটি গাড়ির সুপারভাইজার ওয়াদুদ জানান, শনিবার সুন্দরগঞ্জ থেকে রাজশাহীর উদ্দেশ্যে তাদের গাড়ি ছাড়ার কথা। কিন্তু শহরের একাধিক পাম্পে ঘুরেও ডিজেল না পেয়ে তিনি খালি হাতে ফিরেছেন।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে পরিবহন ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়বে।

