তোষাখানা দুর্নীতি মামলায় দোষী সাবস্ত্য করে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ও তার স্ত্রী বুশরা বিবিকে মোট ১৭ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে দেশটির একটি আদালত।
সরকারি দামী উপহার নিয়ম ভেঙে কম দামে নিজের করে নেওয়ার অভিযোগে শনিবার এই সাজা দেওয়া হয়েছে। তবে শুরু থেকেই ইমরান খান ও বুশরা বিবি তাদের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।
ঘটনাটি আসলে কী?
এই পুরো মামলাটি মূলত বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছ থেকে পাওয়া উপহার বা ‘তোষাখানা’ নিয়ে। মামলায় অভিযোগ আনা হয়, ইমরান খান প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন সৌদি সরকারসহ বিভিন্ন দেশ থেকে পাওয়া দামী সব গয়নাগাটি বাজারদরের চেয়ে অনেক কম দামে কিনে নিয়েছিলেন। নিয়ম অনুযায়ী, বিদেশি উপহার সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হয় অথবা বাজারমূল্য পরিশোধ করে তা নিজের কাছে রাখা যায়।
প্রসিকিউটরদের দাবি, যেসব গয়নার বাজারমূল্য ছিল প্রায় ২ লাখ ৮৫ হাজার ডলার (বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৩ কোটি টাকার বেশি), ইমরান ও তার স্ত্রী সেগুলো মাত্র ১০ হাজার ডলারে কিনে নিয়েছিলেন। পরে সেগুলো চড়া দামে বিক্রি করে লাভবান হওয়ার অভিযোগও আনা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। তবে শুরু থেকেই ইমরান খান এবং বুশরা বিবি এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।
ইমরানের আইনজীবী রানা মুদাসসার উমর বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘আদালত বিবাদী পক্ষের কোনো কথা না শুনেই এই ১৭ বছরের জেল আর মোটা অংকের জরিমানার রায় ঘোষণা করেছে।’
পিটিআই-এর প্রতিক্রিয়া
এই রায়ের পরপরই ক্ষোভ ফেটে পড়েছেন ইমরানের সমর্থকরা। তার দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) এই বিচারকে একটি ‘প্রহসন’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
দলের মুখপাত্র জুলফিকার বুখারি বলেন, ‘কোনো শক্ত প্রমাণ ছাড়াই এই সাজা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং নিয়মকানুনকে ইচ্ছেমতো ব্যাখ্যা করা হয়েছে।’
‘এখানে ন্যায়বিচারের ন্যূনতম নীতিমালা মানা হয়নি এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা মেটাতে আইনকে ব্যবহার করা হচ্ছে’ বলেন বুখারি।
ইমরানের আরেক আইনজীবী সালমান সাফদার জানিয়েছেন, ইমরান খান এই রায়ের বিরুদ্ধে ইসলামাবাদ হাইকোর্টে আপিল করার নির্দেশ দিয়েছেন।
সোশ্যাল মিডিয়ায় দলটির পক্ষ থেকে এই বিচার প্রক্রিয়ার তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে।
জেলখানায় কেমন আছেন ইমরান খান?
৭৩ বছর বয়সী এই সাবেক ক্রিকেট তারকা ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। অনাস্থা ভোটে ক্ষমতা হারানোর পর ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে তিনি কারাগারে আছেন। তার বিরুদ্ধে ডজন ডজন মামলা হয়েছে; যার মধ্যে দুর্নীতি থেকে শুরু করে সন্ত্রাসবাদ এবং রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য ফাঁসের অভিযোগও রয়েছে।
তোশাখানা দুর্নীতি মামলায় তাকে ও তার স্ত্রী বুশরা বিবিকে ১৭ বছরের সাজা দেওয়া হয়েছে, এর মধ্যে ১০ বছর কঠোর কারাদণ্ড ও ৭ বছর দুর্নীতির ধারায় সাজা দেওয়া হয়েছে। জমি সংক্রান্ত অন্য একটি দুর্নীতি মামলায় বর্তমানে তিনি ১৪ বছরের সাজা খাটছেন। এর আগে ১০ বছরের সাজা পেয়েছিলেন ‘রাষ্ট্রী গোপনীয়তা’সংক্রান্ত মামলায় গোপন তথ্য ফাঁস করার অভিযোগে।
সম্প্রতি তার বোন ডাক্তার উজমা খানম তার সঙ্গে দেখা করার পর সাংবাদিকদের জানান, ইমরান খানকে সারাক্ষণ একটি ছোট কামরায় বন্দি করে রাখা হচ্ছে। এই নির্জন কারাবাসকে তিনি ‘মানসিক নির্যাতন’ হিসেবে দেখছেন।
তার বোনের ভাষায়, ‘ইমরান খুবই রাগান্বিত এবং তার মতে এই মানসিক যন্ত্রণা শারীরিক নির্যাতনের চেয়েও ভয়ংকর।’
এতসব মামলার পরও পাকিস্তানে ইমরান খানের জনপ্রিয়তা এখনো আকাশচুম্বী। তার জেল হওয়ার পর থেকে গত দুই বছরে দেশটিতে দফায় দফায় বিক্ষোভ করেছেন তার সমর্থকরা।